গঠন অনুসারে বাক্যের শ্রেণীবিভাগ | সংজ্ঞা ও উদাহরণস্বরূপ বৈশিষ্ট্য | বাক্য পরিবর্তন

বাক্য ভাষার প্রধান উপাদান। আর বাক্যের মৌলিক উপাদান হলো ‘শব্দ’। কয়েকটি শব্দ মিলিত হয়ে যদি একটি পূর্ণ মনের ভাব প্রকাশ করে, তাহলে তাকে বাক্য বলে। যেমন: আমি কলেজে যাই।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘যে পদ বা শব্দ-সমষ্টির দ্বারা কোন বিষয়ে বক্তার ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকটিত হয়, সেই পদ বা শব্দ সমষ্টিকে বাক্য বলে ।’
বাক্যকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়-১.গঠন অনুযায়ী বাক্য। ২. অর্থ অনুযায়ী বাক্য।
বাংলা ব্যাকরণ : বাক্যের শ্রেণীবিভাগ। গঠন অনুসারে বাক্য কয় প্রকার ও তাদের বৈশিষ্ট্য। বাক্য পরিবর্তন।


গঠন অনুযায়ী বাক্য:

গঠন অনুযায়ী বাংলা বাক্য কে চার ভাগে ভাগ করা যায় -
  1. সরল বাক্য
  2. যৌগিক বাক্য 
  3. জটিল বাক্য
  4. মিশ্র বাক্য

সরল বাক্য:-

উপস্থিত হব উহ্য একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া দ্বারা যেসব বাক্য গঠিত হয়, তাদের সরল বাক্য (Simple Sentence) বলা হয়।
উদাহণস্বরূপ:
  1. অভিনাশ ভাত খাচ্ছে। (বর্তমান কাল)
  2. তুমি নদী থেকে জল এনেছিলে? (অতীত কাল)
  3. তুমি এখন এখানে বসবে। (ভবিষ্যৎ কাল)
  4. আমার নাম রুপম। (বর্তমান কাল)
 উপরের প্রথম তিনটি বাক্যে একটা করে সমাপিকা ক্রিয়া রয়েছে। সেগুলি হল 'খাচ্ছে' 'এনেছিলে'এবং 'বসবে' । বাক্যটিতে 'হয়'এই চতুর্থ সমাপিকা ক্রিয়াপদটি উহ্য আছে। তাই এইগুলি সরল বাক্য।

 সরল বাক্যের বৈশিষ্ট্য:

  1. সরল বাক্যে একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে। তার বেশিও নয়, কমও নয়। তবে সমাপিকা টি উহ্যও থাকে।
  2. সরল বাক্যে ক্রিয়া, বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ- তিনটি কালেরই হয়।
  3. সরল বাক্যে বিভিন্ন অর্থেরও হতে পারে। প্রথম চতুর্থ বাক্যটি যেমন ইতিবাচক নির্দেশক বাক্য, দ্বিতীয় টি প্রশ্নবোধক এবং তৃতীয় টি অনুজ্ঞাবাচক বাক্য।
  4. বাংলা ভাষায় ক্রিয়াহিন সরল বাক্যের বহুল ব্যবহার। কেবল 'হওয়া' বা 'থাকা' ক্রিয়ায় বাক্যে উহ্য রাখা হয়। যেমন ওপরের উদাহরণের চতুর্থ বাক্যটিতে 'হয়' ক্রিয়া উহ্য।
  5. সরল বাক্যে এক বা একাধিক অসমাপিকা ক্রিয়া থাকতে পারে। যেমন- মাঠে ছেলেরা ঘুড়ি উড়ানো দেখে আরোলোকেরও ঘুড়ি উড়াতে ইচ্ছা করছিল।- এই বাক্যটিতে দুটি অসমাপিকা ক্রিয়া ( দেখে, ওড়াতে)
  6. সরল বাক্যে অসমাপিকা ক্রিয়া নাও থাকতে পারে। উদাহরণের চারটি বাক্যে যেমন কোন অসমাপিকা ক্রিয়া নেই।
  7. সরল বাক্যে আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক উপাদানের সমাবেশ ঘটে থাকে। নিম্নে উদাহরণ দেওয়া রয়েছে-
  • মা দিচ্ছেন। (কর্তা +অকর্মক ক্রিয়া)
  • মা ভাত দিচ্ছেন। (কর্তা+মুখ্যকর্ম+সকর্মক ক্রিয়া)
  • মা রূপমকে ভাত দিচ্ছেন।(কর্তা+গৌণকর্ম+মুখ্যকর্ম+সকর্মক ক্রিয়া)
  • মা রান্নাঘরে রূপমকে ভাত দিচ্ছেন।(কর্তা+স্থানবাচক পদ+মুখ্যকর্ম+সকর্মক ক্রিয়া)
  • মা রান্নাঘরে সকালবেলায় রূপমকে ভাত দিচ্ছেন।(কর্তা+স্থানবাচক পদ+কালবাচক পদ+মুখ্যকর্ম+সকর্মক ক্রিয়া)
  • মা রান্নাঘরে বসে সকালবেলায় রুপমকে ভাত দিচ্ছেন।(কর্তা+স্থানবাচক পদ+অসমাপিকা+কালবাচক ক্রিয়া+মুখ্যকর্ম+সকর্মক ক্রিয়া)

যৌগিক বাক্য:-

একাধিক সরল বাক্য যখন নিজেদের স্বাধীন অর্থপ্রাধান্য অক্ষুন্ন রেখে উপস্থিত বা উহ্য এক বা একাধিক সংযোজক অব্যয় দ্বারা মিলিত হয়ে একটি মাত্র বাক্য গঠন করে, তখন সে বাক্যকে যৌগিক বাক্য (Compound Sentence) বলা হয়। যেমন-তার তখন মনের অবস্থা বলা কঠিন তবে আন্দাজ করা অন্যায় নয়।

যৌগিক বাক্যের বৈশিষ্ট্য:

  1. ক্রিয়াহীন সরল বাক্য যেমন বাংলা ভাষায় সম্ভব, তেমনই সম্ভব ক্রিয়াহীন যৌগিক বাক্য। যেমন - ওরা চারজন, কিন্তু আমি একা এখানে প্রকৃতপক্ষে দুটি স্বাধীন সরল বাক্য।
  2. শুধুমাত্র ক্রিয়ার দ্বারা যৌগিক বাক্য গঠন এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন-এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।
  3. অনেক যৌগিক বাক্যে অব্যয় উহ্য থাকে। যেমন- ক. কখন সে গেছে ,এখনোও এলো না। খ. আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু। এক্ষেত্রে, প্রথম বাক্যের মাঝে 'অথচ'এবং দ্বিতীয় বাক্যের মাঝে 'এবং' অব্যয় উহ্য বা অনুপস্থিত।
  4. একটিমাত্র অব্যয় দ্বারা গঠিত যৌগিক বাক্যের ব্যবহার আমরা বেশি দেখি। উদাহরণস্বরূপ-
  • ক.সে দেখতে সুন্দর কিন্তু তার মন উদার নয়।(অব্যয়=কিন্তু)
  • খ. কোথাও জলে থইথই করছে কোথাও খরাই মানুষ মরছে।(অব্যয়=কোথাও)
5. অনেক যৌগিক বাক্যে একাধিক অব্যয় থাকে। কখনো একটি অব্যয় দুবাই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ-
  • ক. কখনও জীব বাইরে শক্তি গ্রহণ করে কখনও ভিতরের শক্তি দিয়ে প্রতিহত করে। (অব্যয়= কখনও, কখনও)
  • খ. হয় তুমি পড়তে বসবে না হয় আমাকে সাহায্য করবে। (অব্যয়= হয়, না হয়)
  • গ. হয় খেটে পড়াশোনা করো নতুবা তুমি চাকরির চেষ্টা করো। (অব্যয়= হয়, নতুবা)
তবে এই জাতীয় যৌগিক বাক্যে অনেক সময়ই দুটি অব্যয় এর মধ্যে একটি উহ্য থাকতে পারে। যেমন প্রথম বাক্যে 'কখনও' বা শেষ বাক্যে 'হয়'অব্যয় উহ্য থাকলেও ক্ষতি হয় না অর্থের।

জটিল বাক্য:-

একটি প্রধান খন্ড বাক্য এবং এক বা একাধিক অপ্রধান খন্ড বাক্য দ্বারা যে দীর্ঘ ও সম্পূর্ণ বাক্য গঠিত হয় কাকে বলে জটিল (complex sentence) বাক্য।
সুতরাং প্রতিটি জটিল বাক্য থাকে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য (principal clause) এবং এক বা একাধিক অপ্রধান বা আশ্রিত বা অধীন খন্ডবাক্য (subordinate clause) । নিম্নে উদাহরণ দেওয়া রইল-
  • বারান্দা থেকে দেখলাম যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে
  • তুমি যদি হাস, তাহলে আমি রেগে যাব
উপরের বাক্য দুটিতে স্বাধীন খণ্ডবাক্য দুটি হল যথাক্রমে- 'বারান্দা থেকে দেখলাম' এবং 'তাহলে আমি রেগে যাব'।আর, অধীন খন্ডবাক্য দুটি হল যথাক্রমে- 'যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, এবং 'তুমি যদি হাস'।

জটিল বাক্যের বৈশিষ্ট্য:

১. জটিল বাক্য একটি প্রধান খন্ডবাক্য এবং এক বা একাধিক অপ্রধান খন্ড বাক্য থাকে। জটিল বাক্য অন্তত দুটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে।
২. প্রধান খন্ডবাক্য যেমন বাক্যের শুরুতে থাকতে পারে, তেমনি বাক্যের শেষে ও থাকতে পারে। যেমন-
  • বারান্দা থেকে দেখলাম যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। (প্রধান খন্ডবাক্য বাক্যের শুরুতে)
  • তুমি যদি হাস তাহলে আমি রেগে যাব। (প্রধান খন্ডবাক্য বাক্যের শেষে)
৩. যৌগিক বাক্য যেমন একটি মাত্র অব্যয় কিংবা একাধিক অব্যয় দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে, জটিল বাক্যও তেমনি একটি কিংবা একাধিক অব্যয় দ্বারা গঠিত হতে পারে। যেমন-
  • আমি তাকে বলব যে আমি আর বেশিদিন নেই।
  • যদি কাউকে ভালবাসতে পারো, তবে সাফল্য সুনিশ্চিত।
এখানে প্রথম বাক্যে একটিমাত্র অব্যয় 'যে' এবং দ্বিতীয় বাক্যে দুটি অব্যয় 'যদি' এবং 'তবে' ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. যৌগিক বাক্যের মতো জটিল বাক্য উহ্য থাকতে পারে। যেমন-
  • 'আমি চাই _____ তুমি ভালো হয়ে থাকবে'।
  • '_____ ভালো করে পড়াশোনা করো, _____ বাবা খুশি হবেন'।
এক্ষেত্রে প্রথম বাক্যে 'যে'এবং দ্বিতীয় বাক্যে 'যদি' ও 'তবে' অব্যয় উহ্য হয়েছে।

জটিল বাক্যের শ্রেণীবিভাগ:

বিশেষ্যবাচক জটিল বাক্য: যে জটিল বাক্যের অধীন খন্ড বাক্যটি প্রধান খন্ড বাক্যের অন্তর্গত কোন পদের বিশেষ গুচ্ছ হয়ে অবস্থান করে, তাকে বিশেষ্যবাচক জটিল বাক্য বলে।
বিশেষণবাচক জটিল বাক্য: যে জটিল বাক্যের প্রথমে অবস্থিত অপ্রধান খন্ড বাক্যটি পরে অবশ্য প্রধান খন্ড বাক্যের অন্তর্গত কোন বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ কে বিশেষিত করে এবং যে বাক্যে সাধারণত জোড়া সাপেক্ষ বা প্রতি নির্দেশক (correlative) সর্বনাম দ্বারা খন্ডবাক্য দুটি যুক্ত থাকে, তাকে বিশেষণবাচক জটিল বাক্য বলে।
ক্রিয়াবিশেষণ বাচক জটিল বাক্য: যে জটিল বাক্যে পরে অবস্থিত অপ্রধান খন্ড বাক্য টি প্রথমে অবস্থিত প্রধান খন্ড বাক্যের ক্রিয়ার প্রকৃতি, অবস্থা ইত্যাদিকে নির্দেশ করে এবং সাধারণত প্রধান খন্ড বাক্যের সঙ্গে 'যদি' অব্যয় এবং অপ্রধান বাক্যের সঙ্গে 'তবে', 'তাহলে', 'না হয়', 'সেক্ষেত্রে' ইত্যাদি কোন অব্যয় ব্যবহৃত হয়, তাকে বিশেষণবাচক জটিল বাক্য বলে।

মিশ্র বাক্য:

ভিন্ন জাতীয় বা সমজাতীয় সরল ও যৌগিক বা সরল ও জটিল বা যৌগিক ও যৌগিক বা যৌগিক ও জটিল কিংবা জটিল ও জটিল বাক্য যুক্ত হতে মিশ্র আকারের বৃহত্তর কোনো জটিল বা যৌগিক বাক্য সৃষ্টি করলে, তাকে মিশ্র বাক্য (Mixed Sentence) বলে।

মিশ্র বাক্যের শ্রেণীবিভাগ:

যৌগিক + সরল = জটিল:
  • রামনাথ এই যে টাকা আনিয়াছিলেন এবং কন্যার নিষেধে সে টাকা না দিয়াই চলিয়া গিয়াছেন।, সে কথা গোপন রহিল না
সরল + জটিল = যৌগিক:
  • আমরা বাড়ি এলেম আর বাবাও এলেন এক ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে, যে বাবার অফিসে চাকরি করে
যৌগিক + যৌগিক = জটিল:
  • আমি যে নিজেই রান্না করি এবং ভাত বেড়ে খাই, তা দাদার ভালো লাগেনা অথচ আমাকে কখনো সাহায্য করে না
যৌগিক + জটিল = যৌগিক:
  • খোকাবাবু ডাক্তার লোক, কিন্তু ডাক্তারি করেন না, কলম চালানো হলো তার পেশা, যা তাকে ডাল ভাতের সংস্থানটুকু করে দেয়
জটিল + জটিল = যৌগিক:
  • ছোড়দা, যার কথা তোমায় বলেছিলাম, বড্ড ঠোঁটকাটা সেজন্য মা উঠতে বসতে বকেন, যদিও স্নেহ করেন আমাদের চেয়ে বেশি ছোড়দাকে