ভারতের মৌলিক অধিকার কি ও তার বৈশিষ্ট্য | রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি | Fundamental Rights of India

মৌলিক অধিকার কি ও তার বৈশিষ্ট্য :

নাগরিকগণের ব্যক্তিত্ব বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য কতগুলি অধিকার পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রেই স্বীকৃত হয়েছে। জীবনের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার প্রভৃতি এই শ্রেণীর অধিকারের পর্যায়ভুক্ত। এই অধিকার গুলি কে মৌলিক অধিকার  (Fundamental Rights) বলে অভিহিত করা হয়। মৌলিক অধিকার হলো রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য অধিকার।

মৌলিক অধিকার ও সাধারণ অধিকারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন, সাধারণ অধিকার গুলি দেশের সাধারন আইনের দ্বারা সংরক্ষিত ও রূপায়িত হয়। মৌলিক অধিকার গুলির কোন পরিবর্তন বা সংশোধন, সংবিধানের সংশোধন না ঘটিয়ে করা যায় না।
ভারতের মৌলিক অধিকার কি ও তার বৈশিষ্ট্য | রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি | Fundamental Rights of India

মৌলিক অধিকার গুলি :

  1. সাম্যের অধিকার (১৪-১৮ ধারা) : জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রতি নাগরিকের সমান অধিকার ।
  2. স্বাধীনতার অধিকার (১৯-২২ ধারা) : বাক ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, ইউনিয়ন গঠন, দেশের সর্বত্র স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার।
  3. শোশনের বিরুদ্ধে অধিকার (২৩-২৪ ধারা): বিনা বেতনে বেগার খাটানো, মানুষ ক্রয় বিক্রয়, ১৪ বছরের কম বয়সের শিশুদের কারখানা বা খনির কাজে লাগানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
  4. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (২৫-২৮ ধারা) : কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হতে পারেন এবং কোনো নাগরিককে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা যাবে না । ব্যক্তির ইচ্ছে অনুযায়ী ধর্ম পালন করার অধিকার আছে।
  5. শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার (২৯-৩০ ধারা) : নাগরিকদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার মৌলিক অধিকারের ভিতর ধরা হয়েছে।
  6. সংবিধান প্রতিবিধানের অধিকার (৩২ এবং ২২৬ ধারা): কোনো নাগরিক উপরিউক্ত অধিকারগুলি বা কোনো একটি অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে, তিনি সুপ্রিম কোর্টে প্রতিকারের জন্য আবেদন করতে পারেন।

মৌলিক অধিকারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য:

  • মৌলিক অধিকার হলো ব্যক্তিজীবনের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে মৌলিক বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
  • মৌলিক অধিকার আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য।
  • দেশের সংবিধান কর্তৃক এই অধিকার গুলি স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়।
  • মৌলিক অধিকার গুলি আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক অধিকার গুলি রচনার সময়, সংবিধান রচয়িতা দের উপর বিভিন্ন সংবিধান ও মতবাদের প্রভাব পড়েছে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারের সনদ। এছাড়াও মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম চতুর্দশ সংশোধনী, মানবাধিকার সম্পর্কে ফরাসি ঘোষণা, মানবাধিকার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ঘোষণা, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের আয়ারল্যান্ডের সংবিধান, ডাইসির আইনের অনুশাসন তত্ত্ব (theory of rule of law) গান্ধীবাদ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত সকল মৌলিক অধিকার সকল দেশের অধিবাসী ভোগ করতে পারে না। কতগুলি মৌলিক অধিকার আছে যা কেবলমাত্র ভারতীয় নাগরিক গনি ভোগ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় : মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সমান অধিকার, ভারতের যেকোনো জায়গায় যাতায়াত ও বসবাসের অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার, সমিতি গঠনের অধিকার প্রভৃতি। আবার কতগুলি মৌলিক অধিকার আছে যা নাগরিক ও বিদেশী ভোগ করতে পারে। যেমন, আইনের চোখে সমান অধিকার, জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার প্রভৃতি।

কর্মের অধিকার, শ্রমমানভিত্তিক মজুরি পাবার অধিকার প্রভৃতি অর্থনৈতিক অধিকার গুলি ভারতীয় সংবিধানের স্বীকৃত হয়নি। স্বাভাবিক অবস্থায় মৌলিক অধিকার কোনভাবে খর্বিত হলে, নাগরিকগণ আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারে। কিন্তু জরুরি অবস্থা বলবৎ থাকাকালীন সময়ে মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে নাগরিকগণ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে না। ফলে এই সময়ে মৌলিক অধিকার কে লংঘন করে আইনবিভাগ আইন প্রণয়ন করবে, এবং শাসন বিভাগ কোন নির্দেশ জারি করলে তা আদালত কর্তৃক বিবেচনাধীন নয়। তবে সংবিধানের ৪৪ তম সংশোধনের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, কোন অবস্থাতেই ২১নং ধারার জীবন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার কে স্থগিত বা লংঘন করা যাবে না।

মৌলিক অধিকার গুলি অবাধ বা অনিয়ন্ত্রিত নয়। ভারত রাষ্ট্র সমাজ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মৌলিক অধিকার গুলির উপর সাধারণ অবস্থাতেও 'যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ' আরোপ করতে পারে।

ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকার গুলি বিচার বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। স্বাভাবিক অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট ৩২নং ধারা অনুসারে ও হাইকোর্ট ২২৬নং ধারা অনুসারে নির্দেশ বা আদেশ (writs) জারির মাধ্যমে মৌলিক অধিকার গুলি কে সংরক্ষিত করে থাকেন।

রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতি :

সংবিধানের ৩৬ এবং ৫১ নম্বর ধারায় এর উল্লেখ রয়েছে। এই অংশটি, ভারতীয় সংবিধানে অর্ন্তভূক্ত করার ধারণাটি নেওয়া হয়েছে আয়ারল্যান্ডের সংবিধান থেকে। উভয়ই প্রকৃতিগতভাবে একপ্রকার অধিকার। কিন্তু বৈসাদৃশ্য হল- মৌলিক অধিকারের আইনগত স্বীকৃতি ও ভিত্তি আছে। অপরদিকে, নির্দেশমূলক নীতি গুলির তা নেই। ফলে মৌলিক অধিকার গুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতি গুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয়। মূল সংবিধানে ১৩ টি নির্দেশমূলক নীতি ছিল, ১৯৭৬ সালে ৪২ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আরো আটটি নির্দেশমূলক নীতি যুক্ত করা হয়েছে।