Header Ads Widget

ভাইরাস কাকে বলে | ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য | ভাইরাস আক্রান্ত রোগ এবং তার লক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ভাইরাস:

ভাইরাস একটি ল্যাটিন শব্দ যার শব্দতত্ত্বগত অর্থ হলো 'বিষ'। ভাইরাস (Virus)হল একপ্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ১৫৭৬ সালে ক্যারোলাস ক্লাসিয়াস প্রথম ভাইরাস সম্বন্ধে ধারণা দেন এবং ১৭৯৬ সালে জেনার সর্বপ্রথম ভাইরাস আক্রান্ত বসন্ত রোগের বিষয়টি বলেন। ১৮৯২ সালে জে.ভি.ভি আইয়োনস্কি, সংক্রামক তামাক পাতার রস ব্যাকটেরিয়া ফিল্টারে পরিস্রুত করার পর সংক্রামক যোগ্য তরলের খোঁজ পান, এই সংক্রামিত তরলকে ভাইরাস বলে। ১৯৩৫ সালে স্ট্যানলি ভাইরাসকে সমস্ত রকমের 'সংক্রামক প্রোটিন অনু' বলে অভিহিত করেন।
ভাইরাস কি | ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য | ভাইরাস আক্রান্ত রোগ এবং তার লক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা
চিত্র : ভাইরাস

ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য:

  1. ভাইরাস হলো জীব এবং জড়ের মধ্যবর্তী এক প্রকার বস্তু।
  2. দেহে সাইটোপ্লাজম থাকেনা বলে ভাইরাস অকোষীয়।
  3. ভাইরাস এ প্রজনন ঘটে শুধুমাত্র পোষক কোষেই।
  4. ভাইরাস দেখা যায় শুধুমাত্র ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে।
  5. প্রকরণ ও অভিযোজন ক্ষমতা ভাইরাসের আছে।
  6. ভাইরাসের দেহে DNA বা RNA যেকোনো এক প্রকারের নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে।
  7. আলুর x ভাইরাস (500nm × 10nm) ও বসন্ত ভাইরাস (300-400nm) সর্বাপেক্ষা বড় আয়তনের ভাইরাস।
  8. রাইনো ভাইরাস (10nm) হল সবচেয়ে ছোট আয়তনের ভাইরাস ।
  9. বহিঃকোষীয় ও অন্তঃকোষীয় এই দুই দশাই দেহে ভাইরাস দেখা যায়।


ভাইরাসের আকৃতি ও তার শ্রেণীবিভাগ:

  • ডিম্বাকার :- ইনফ্লুয়েঞ্জা ও মাম্পস রোগের ভাইরাস।
  • গোলাকার :- গবাদি পশুর পা এবং মুখে রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস, পোলিও, জাপানি এনকেফালাইটিস রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস।
  • ঘনকাকার :- বসন্ত রোগের ভাইরাস (ভ্যাকাসেনিয়া ও ভ্যারিওলা) ও হারপিস।
  • দন্ডাকার :- তামাক পাতার টোবাকো মোজাইক এবং আলুর ব্লাইট।
  • ব্যাঙ্গাচি বা শুক্রাণু আকার :- ফায ভাইরাস কিংবা ব্যাকটিরিও ফাজ।

ভাইরাসের গঠন সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  1. ভাইরাস দেহকে প্রধান দুটি অংশে ভাগ করা যায়- ক্যাপসিড বা বহিরাবরণ ক্যাপসিড এর অভ্যন্তরে অবস্থিত ভাইরাস-জিনোম ও নিউক্লিওয়েড।
  2. ভিরিয়ন হল সংক্রমণ যোগ্য ভাইরাস একক।
  3. ভাইরয়েড হল RNA যুক্ত ক্যাপসিড বিহীন ভাইরাস।
  4. ক্যাপসিড এর সাংগঠনিক একক হল ক্যাপসোমিয়র।
  5. প্রোটিন দ্বারা গঠিত ভাইরাসের বহিরাবরণ হল ক্যাপসিড।
  6. লিপিড এবং প্রোটিন দ্বারা গঠিত ক্যাপসিড এর বহিরাবরণ হল এনভেলাপ।
  7. পেলপোমিয়ার হল এনভেলাপ এর সাংগঠনিক একক।
  8. রাউস ভাইরাস হল ক্যাপসিড বিহীন ভাইরাস।
  9. ক্যাপসিজযুক্ত ভাইরাস হল TMV, ফাজ ভারাস ইত্যাদি।
  10. ইনভেলাপ যুক্ত ভাইরাস হলো বসন্ত ভাইরাস।
  11. লিপোভাইরাস হলো ইনভেলাপ যুক্ত।


ভাইরাস আক্রান্ত রোগ এবং তার লক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা :-

রোগ : গুটি বসন্ত বা স্মল পক্স
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- ভ্যারিওল সপি (Variola sp.) 
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- গুটি শুকানোর সময় বায়ুর দ্বারা।
  • রোগের লক্ষণ :- সারা শরীরে গুটি হয়। মুখে, হাতে এবং পায়ে বেশি হয়। সেরে গেলে ক্ষত চিহ্ন থাকে।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- আলাদা করে রোগীকে রাখা; ভ্যাকসিন দেওয়া।
রোগ : চিকেন পক্স বা জলবসন্ত
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- ভ্যাকসিনিয়া স্পি ( Vaccinia sp.)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- গুটি শুকানোর সময় বায়ুর দ্বারা।
  • রোগের লক্ষণ :- জ্বরের সাথে সারা শরীরে গুটি উঠতে থাকে। মুখে, হাতে ও পায়ে বেশি হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- আলাদা করে রোগীকে রাখা; খোসা গুলি বা গুটির মামড়ি জমিয়ে পুড়িয়ে ফেলা; রোগীর ব্যবহৃত বিছানাপত্র, জামা কাপড় নজর করা।
রোগ : হাম বা মিসল
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- রুবেল্লা ভাইরাস ( Rubella Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- বায়ুর দ্বারা রোগীর গলার ও নাকের মিউমেস থেকে রোগ ছড়ায়।
  • রোগের লক্ষণ :- শুরুতে হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়ে। গা, হাত, পা ব্যথাসহ তীব্র জ্বর হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- টীকা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা, রোগীকে আলাদা করে রাখা।
রোগ : জলাতঙ্ক
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- রবিস ভাইরাস Robies Virus (Streat Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- বিড়াল, কুকুর, শেয়াল ইত্যাদি পাগল হয়ে কামড়ালে হয়।
  • রোগের লক্ষণ :- জ্বর, তীব্র মাথা ব্যথা, ঢোক গিলতে কষ্ট হয়, তৃষ্ণা থাকলেও জলে আতঙ্ক। সুষুম্নাকাণ্ড ও মস্তিষ্কের স্নায়ু ধ্বংস হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- রেবিস এর প্রতিশোধ সিরাম ইনজেকশন নেওয়া।
রোগ : মাম্পস
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- মাম্পস ভাইরাস (Mumps Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- কফ, থুতু, সর্দি থেকে বিস্তার।
  • রোগের লক্ষণ :- গলা, গাল ফুলে ব্যথা হয়, জ্বর হতে পারে। লালাগ্রন্থি প্রধানত প্যারোটিড গ্রন্থি আক্রান্ত হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- রোগীকে আলাদা করে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া।
রোগ : জন্ডিস বা হেপাটাইটিস
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- হেপাটাইটিস ভাইরাস (Hepatitis Virus-A,B) (HAV,HBV)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- সংক্রমিত পানীয় জল এবং রক্ত দ্বারা।
  • রোগের লক্ষণ :- যকৃত আক্রান্ত হয়, রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায়, মূত্র, চামড়া, চোখ হলুদ হয়ে যায়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- খাদ্য দ্রব্য নিয়ন্ত্রন করা ও রোগীকে বিশ্রাম দেওয়া।
রোগ : ইনফ্লুয়েঞ্জা
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- অর্থমিক্স ভাইরাস (Influenza farvirus or Orthomixo Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- রোগীর কাশি, হাঁচি এবং বের হওয়া মিউকস দ্বারা।
  • রোগের লক্ষণ :- শুরুতে হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়ে। গা, হাত, পা ব্যথা সহ তীব্র জ্বর হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও রোগীকে আলাদা করে রাখা।
রোগ : পোলিও
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- Pliomyelitis sp.
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- মাছির দ্বারা খাদ্য এবং জল থেকে।
  • রোগের লক্ষণ :- সুষুম্না কান্ডের চেষ্টীয় অংশ আক্রান্ত হয় বলে পা এবং হাতের প্যারালাইসিস হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- ভ্যাক্সিনেশন ধারা।
রোগ : কমন কোল্ড বা সাধারণ কোল্ড
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- রাইনো ভাইরাস (Rhino Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- আক্রান্ত রোগীর কাশি হাঁচির ধারা।
  • রোগের লক্ষণ :- জ্বর, চোখ দিয়ে জল পড়া,হাঁচি, কাশি, মাথার যন্ত্রনা, গা হাত পা ব্যথা, অস্বস্তি ভাব।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- সাধারণ ওষুধ সেবন।
রোগ : এইডস/AIDS
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- HIV
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- আক্রান্ত রোগীর রক্ত, রক্ত রস, বীর্য থেকে।
  • রোগের লক্ষণ :- রোগ bপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- কোনরকম রক্ত, রক্ত রস, বীর্য ইত্যাদি যেন অন্য শরীরে না যায় সেদিকে নজর রাখা। কোনো প্রতিষেধক নেই।
রোগ : ডেঙ্গু জ্বর
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- ডেঙ্গু ভাইরাস (Dengu Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- মশার দ্বারা।
  • রোগের লক্ষণ :- সারা দেহ ও মাথা তীব্র যন্ত্রণা, মূলত অস্থিগুলো বেশি আক্রান্ত হয়। খুব জ্বর হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- সাধারণ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়ানো।
রোগ : এনকেফেলাইটিস
  • আক্রমণকারী ভাইরাস :- এনকেফেলাইটিস ভাইরাস (Encephalitis Virus)
  • রোগ বিস্তারের পদ্ধতি :- মূলত মশার দ্বারা (এডিস মশা ও কিউলেক্স মশা)
  • রোগের লক্ষণ :- মাথায় খুব যন্ত্রণা সহ জ্বর, আচ্ছন্নতা, স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা :- মশা থেকে নিষ্কৃতি এবং এন্টিবায়োটিক খাওয়া।