Header Ads Widget

নবম শ্রেণীর ভূগোলের পৃথিবীর গতি সমূহ অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং উত্তর ।

আজকে আমরা আলোচনা করব নবম শ্রেণীর ভূগোলের পৃথিবীর গতি সমূহ অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং উত্তর যেগুলো আমাদের জানা এবং পড়া অত্যন্ত প্রয়োজন ।


কমবেশি ১৫০ টি শব্দের মধ্যে উত্তর দাও। প্রতিটা প্রশ্নের মান- (৫)






(১) নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মকালে বড়দিন পালন করা হয় কেন ?

উত্তর - নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মকালে বড়দিন পালন করা হয় তার কারণ হলো নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ গোলার্ধের একটি দেশ। সূর্যকে পরিক্রমণ করার সময়, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এই তিন মাস পৃথিবী তার কক্ষপথে এমনভাবে অবস্থান করে যে, এইসময় দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে এবং উত্তর গোলার্ধ সূর্য থেকে দূরে থাকে। তাই, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে শীতকাল হয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল হয়। যেহেতু বড়দিন পালন করা হয় 25 ডিসেম্বর, তাই তখন দক্ষিণ গোলার্ধে গৃষ্ম কাল এবং উত্তর গোলার্ধে শীতকাল। এইজন্য নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মকালে বড়দিন পালন করা হয় ।


(২) নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে উত্তাপ কমে যায় কখন ?

উত্তর - নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে ক্রমশ উত্তাপ কমে যায় তার কারণ হল—পৃথিবীর গােলীয় আকার, পরিক্রমণ গতি, পৃথিবীর মেরুরেখার সঙ্গে 66° কোণে অবস্থান ইত্যাদি কারণে ।পৃথিবীর সর্বত্র সূর্যের আলাে সমানভাবে পড়ে না এবং উত্তাপ সমান হয় না। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যালােক লম্বভাবে এবং মেরুর দিকে হেলে পড়ে। তাই নিরক্ষীয় অঞ্লে উত্তাপ বেশি হয়। কিন্তু মেরু অঞ্চলে উত্তাপ কম হয়। এর কারণগুলি হল [1] তির্যক রশ্মি বেশি বায়ুস্তর ভেদ করে আসে তাই একে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। [2] তির্যক রশ্মি অনেক বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ।

(৩) প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর গতির পর্যবেক্ষণের ইতিহাস লেখো ?

উত্তর - পৃথিবীর গতি সম্বন্ধীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ইতিহাস:- বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর গতির প্রমাণ সম্পর্কে নানা ধরনের মতপার্থক্য ছিল। প্রাচীনকালের বহু দার্শনিক, বিজ্ঞানী, ভৌগােলিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নানা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর গতি সম্পর্কে নানা ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এরূপ মতপার্থক্যের ফলশ্রুতি হিসেবে দু-ধরনের মতবাদের সৃষ্টি হয়। যথা [1] পৃথিবীকেন্দ্রিক (geocentric) মতবাদ এবং [2] সূর্যকেন্দ্রিক (heliocentric) মতবাদ ।

পৃথিবী কেন্দ্রিক মতবাদ : প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পােষণ করতেন। তাঁরা মনে করতেন, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে সূর্য, চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহরা ঘুরছে। এঁদের মধ্যে অ্যারিস্টটল (384-322 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), হেরাক্লিড (330 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), অ্যারিস্টার্কাস (312-230 খ্রিস্টপূর্বাব্দ), টলেমি (90-168 খ্রিস্টাব্দ) প্রমুখ প্রধান। প্লেটো মনে করতেন, ব্রহ্মান্ডের ঠিক মাঝখানে পৃথিবী অবস্থা করছে। মধ্যযুগে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও এই মতবাদের সমর্থক ছিলেন।
[2) সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ : ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট (476-550 খ্রি.) প্রথম বলেন যে, পৃথিবী স্থির নয় এটি গতিশীল এবং পৃথিবী প্রতিদিন একবার করে নিজ অক্ষে পাক খায়। তবে 1530 খ্রিস্টাব্দে পােল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস তাঁর প্রন্থে প্রথম উল্লেখ করেন, পৃথিবী তার নিজের আক্ষের ওপর সর্বদা ঘুরছে। অর্থাৎ, তিনিই প্রথম সূর্য কেন্দ্রিক ধারণা দেন। পরবর্তীকালে জোহানেস কেপলার 1609 খ্রিস্টাব্দে বলেন, গ্রহগুলোর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। গ্যালিলিও গ্যালিলি দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেন এবং উপগ্রহগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করেন। পরে 1687 খ্রিস্টাব্দে স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ সূত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেন পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ গুলি সূর্যের চারিদিকে পরিক্রমণ করছে। এডমন্ড হ্যালি (1656-1742 খ্রি.) ধুমকেতু পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। বর্তমানকালে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রমাণ করা গেছে যে, সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদটিই সঠিক।


(৪) পৃথিবীর আহ্নিক গতির সপক্ষে প্রমাণগুলি লেখ

উত্তর - পৃথিবীর আহ্নিক গতির সাপেক্ষে প্রমাণসমূহ: যে গতির দ্বারা পৃথিবী নিজ অক্ষ বা মেরুদণ্ডের ওপর পশ্চিম থেকে পর্বে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ডে বা প্রায় 24 ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে, সেই গতিকে আবর্তন বা আহ্নিক গতি (rotational movement) বলা হয়। পৃথিবীর যে আহ্নিক গতি আছে তা বিভিন্নভাবে প্রমাণ করা যায়, যেমন-
[1] দিন ও রাতের পর্যায়ক্রমিক সংঘটন; - আবর্তন গতি আছে বলেই মােটামুটি প্রতি 24 ঘণ্টায় পৃথিবীর যে-কোন স্থান পর্যায়ক্রমে একবার সূর্যের সামনে আসে। যদি পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকত, তাহলে পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের সামনে থাকত সেখানে সবসময়েই দিন ও বিপরীত অংশে চির অন্ধকার বা রাত বিরাজ করত।

[2] পৃথিবীর অভিগত গােলীয় আকৃতি: কোনাে নমনীয় বস্তু তার অক্ষরেখার চারিদিকে অনবরত আবর্তন করলে মাঝাখানে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রবিমুখ শক্তির উদ্ভব হয় এবং এর ফলে বস্তুর মধ্যভাগ কিছুটা স্ফীত এবং প্রান্তদ্বয় কিছুটা চাপা হয়। পৃথিবী নিজের মেরুদণ্ডের চারিদিকে অনবরত আবর্তন করে চলেছে বলেই পৃথিবীর মেরুদ্বয় চাপা ও নিরক্ষীয় অংশ স্ফীত হয়েছে।
[3] খুব উঁচু স্থান থেকে পতনশীল প্রস্তরখণ্ডের আপাত সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ: খুব উঁচু স্থান থেকে একটি প্রস্তরখণ্ড নিল বায়ুর মধ্য দিয়ে নীচে ফেলে দিলে দেখা যায় পাথরটি সােজাসুজি না পড়ে একটু পূর্বদিকে এগিয়ে পড়ে। পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য ঘটনা ঘটে ।
[4]কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তােলা ছবি : মহাকাশে পাঠানাে বিভিন্ন কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে যে ছবি তােলা হয়েছে তা থেকে পৃথিবীর আবর্তন গতির নির্ভুল ও সর্বাধুনিক প্রমাণ পাওয়া যায়।


(৫) পৃথিবীর আহ্নিক গতির ফলাফল আলোচনা করো ।

উত্তর - পৃথিবীর যেকোনো একটি গতিবেগ গতির ফলাফল হল -- যে গতির সারা পৃথিবী নিজ অক্ষে মেরুদন্ডের উপরে পশ্চিম থেকে পূর্বে (ঘড়ির কাটার বিপরীতে) 2 মণ্টা এ মিনিট 4 সেকেন্ডে বা প্রায় 24 ঘণ্টায় একবার আবর্তন করে, সেই গতিকে আবর্তন বা আহ্নিক গতি বলা হয়।
পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলাফল সমূহ ॥ [1]পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত সংগঠন : পৃথিবী গােলাকার এবং নিজস্ব কোনাে আলো নেই। সূর্যের আলোতে পৃথিবী আলােকিত এবং উত্তপ্ত হয়। তাই আবর্তন করার সময় পর্যায়ক্রমে গােলাকার পৃথিবীর যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে, সেখানে হয় দিন। বিপরীত অংশে সূর্যের ঙে পড়ে না, সঙ্গে সেখানে হয় রাত ।
(2) সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করে বলেই প্রতিদিন পূর্ব দিকে সূর্যোদয় এবং পশ্চিম দিকে সূর্যাস্ত হয়।
[3]সময় নির্ধারণ: নিজ অক্ষের ওপর এবার সম্পূর্ণভাবে আবর্তন করতে পৃথিবীর সময় লাগে প্রায় 24 ঘণ্টা বা 1 দিন। প্রতিটি ঘন্টা 60 মিনিটে এবং প্রতিটি মিনিটকে 60 সেকেন্ডে ভাগ করে সমাজের সময় নির্ধারণ করা যায় ।
[4] নিয়ত বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের দিক বিক্ষেপ -- নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে পৃথিবীর পরিধি ক্রমশ কমতে থাকে ফলে নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি হয় এবং মেরুর দিকে ক্রমশ কমে যায়। পৃথিবীর আবর্তন বেগের এই অর্থের জন্য নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হায় ।
[ 5]জোয়ারভাটা সৃষ্টি; মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম অনুসারে চাঁদ ও সুর্য উভয়ই পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু সূর্যের তুলনায় চাদ পৃথিবীর নিকটবর্তী বলে পৃথিবীর ওপর চাদের আকর্ষণের প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশি আবর্তনের সময় পৃথিবীর যে স্থান চাদের সামনে আসে সেই স্থানের জলরাশি ফুলে ওঠে অর্থাৎ সেই স্থানে মুখ্য জোয়ার হয়। একই সময় এর ঠিক বিপরীত দিকে, পৃথিবীর আবর্তনের ফলে উদ্ভূত কেন্দ্র বহির্মুখী বা বিকর্ষণ শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয় এবং এর সমকোণে অবস্থিত স্থানগুলিতে তখন ভাটা হয়।
(6) উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ সৃষ্টি: আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীর নির্দিষ্ট একটি অর্ধাংশে চিরকাল রাত থাকত, ফলে আলাে ও উত্তাপের অভাবে কোনাে কিছুই জন্মাতে পারত না। আর, অপর অর্ধাংশে চিরকাল দিন থাকে—প্রচণ্ড উত্তাপে সেখানেও কোনাে কিছু জন্মাতে পারত না। আবর্তন গতির জন্য পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত হয় বলেও তাপের সমতা বজায় থাকে এবং পৃথিবীতে জীবজগৎ সৃষ্টি হয়েছে ।