নবম শ্রেণীর ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়ের কিছু বড় প্রশ্ন এবং উত্তর । জারতন্ত্রের আমলে রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল ?

আজকে আমরা আলোচনা করব নবম শ্রেণীর ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায়ের কিছু বড় প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে তো চলুন শুরু করা যাক । part 1





(১) জারতন্ত্রের আমলে রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল ?

উত্তর
উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে রাশিয়ায় জার, সৈন্যবাহিনী ও তার অনুগামী অভিজাতদের নিয়ে জারতন্ত্রের শাসন-কাঠামো গড়ে উঠেছিল।

✓✓জারতন্ত্রের আমলে রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা

1. জারের ক্ষমতা : চূড়ান্ত স্বৈরতান্ত্রিক জার বা জারিনা ছিলেন রুশ শাসনের কেন্দ্রবিন্দু ও যাবতীয় ক্ষমতার উৎস। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে প্রচার করতেন। জারের হুকুম এবং ইচ্ছাই ছিল দেশের আইন। তিনি প্রদেশে সামরিক গভর্নর এবং গ্রামে মির নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

2. ডুমা : অভিজাতদের নিয়ে গড়ে ওঠা রুশ পার্লামেন্ট ডুমা ছিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ| তবে ডুমার সদস্যরা জনসাধারণের ভােটে নির্বাচিত হত না। ডুমা মূলত জারের নির্দেশেই চলত।

3. ভিজাততন্ত্র : রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অভিজাতদের প্রবল আধিপত্য ছিল। সরকারের অধিকাংশ পদ তাদেরই দখলে ছিল। শাসন ব্যবস্থায় যোগ্যতা পরিবর্তে অভিজাতদের বংশমর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো ।

4. দুর্নীতি : জারতন্ত্রের সর্বত্র সীমাহীন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সরকারি কর্মচারীরা ছিল অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ| রাজস্ববিভাগের কর্মচারীরা সরকারি অর্থ আহ্সাৎ করত। অধিকাংশ বিচারক ঘুষ নিয়ে ঘুষ দাতার পক্ষে রায় দিত।

5. কাউন্সিল অব এম্পায়ার : জারের কাজে সহায়তার জন্য কাউন্সিল অব এম্পায়ার নামে একটি সমিতি ছিল যার পরিচালক এবং সদস্যদের নিয়ােগ করতেন স্বয়ং জার।

(২) রাশিয়ার নারোদনিক বা জনতাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে কি জানো ?

উত্তর
রাশিয়ার নিহিলিস্ট বিপ্লবী জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের হত্যা (১৮৮১ ফ্রি.) করলে মানুষ আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে।

✓✓নারোদনিক আন্দোলন

আন্দোলন নিহিলিস্ট আন্দোলনের ব্যর্থতার পর রাশিয়ায় নারোদনিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

1. আন্দোলনের সূত্রপাত : ১৮৭০-এর দশকে রাশিয়ায় নারােদনিক বা জনতাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। নারােদনিক বিপ্লবীরা ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে জনতার কাছে যাওয়ার আন্দোলন আরম্ভ করে। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে আন্দোলনকারীদের জনসংযোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছায়।

2. শক্তিবৃদ্ধি: ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে নিহিলিস্ট আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়লে নিহিলিস্ট আন্দোলনকারীরা জনতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে জনতাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

3. প্রচারাভিযান : আন্দোলনের ভাবধারা কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নারােদনিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষিত যুবক যুবতীরা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তারা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালায়। কিন্তু রুশ কৃষকরা তখনও সচেতন না হওয়ায় প্রচারের বিশেষ ফল পাওয়া যায়নি।

4. সন্ত্রাসবাদ : দেশের সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে শামিল করতে ব্যর্থ হয়ে নারােদনিক আন্দোলনকারীরা সন্ত্রাসবাদের পথ ধরে । ফলে আন্দোলনকারীদের ওপর তীব্র সরকারের দমন-পীড়ন শুরু হয় ।

(৩) রক্তাক্ত রবিবার সম্পর্কে কি জানো নিজের ভাষায় লেখো ?

উত্তর
রাশিয়ার বিপ্লবের ইতিহাসে 'রক্তাক্ত রবিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

✓✓রক্তাক্ত রবিবার

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি (রাশিয়ার নতুন ক্যালেন্ডার অনুসারে ২২ জানুয়ারি) রক্তাক্ত রবিবারের ঘটনাটি ঘটে।

1 শ্রমিকদের মিছিল : ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি রবিবার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক ফাদার গ্যাপন-এর নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ মিছিলে শামিল হয়।

2. শ্রমিকদের দাবি : মিছিলে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের প্রধান দাবিগুলি ছিল[i] কারখানায় কাজের সময়সীমা কমিয়ে আট ঘণ্টা করা, [ii] রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিদান, [iii] সংবিধান সভা আহবান প্রভৃতি।

3. মিছিলে গুলিবর্ষণ: জারের পুলিশবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তিপূর্ণ মিছিলের শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। গুলিতে ১ হাজারেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে এবং ২ হাজারেরও বেশি শ্রমিক আহত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রক্তাক্ত রবিবার' নামে পরিচিত।

4. বিপ্লবের প্রসার : রক্তাক্ত রবিবারের ঘটনার পর রাশিয়ার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হয় । গ্রামে বিদ্রোহীরা জমিদারের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় । সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয় ।

(৪) রুশ / নভেম্বর / বলশেভিক বিপ্লবের 1917 খ্রিস্টাব্দে অর্থনৈতিক কারণ গুলি উল্লেখ করো ?

উত্তর
১৫ খ্রিস্টাম্পে রাশিয়ায় যে বিপ্লব সংঘটিত হয় তাকে বিপ্লবী নেতা ট্রটস্কি ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের মহড়া বলে অাহিত করেছেন।

✓✓ রুশ/নভেম্বর/বলশেভিক দিল্লভের (১৯১৭ খ্রি) অর্থনৈতিক কারণ

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ছিল। যেমন রুশ বিপ্লবের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণ ছিল যেমন ------

1. অর্থনৈতিক বৈষম্য: জারতন্ত্র আমলে রাশিয়ার বেশিরভাগ জমি মুষ্টিমেয় ধনী অভিজাত পরিবারের হাতে ছিল দরিদ্র কৃষকরা অধিকাংশই ছিল খুব সামান্য জমির মালিক। তারা এই জমি কোনাে ধনী মালিককে লিজ দিয়ে তার অধীনে মজুরের কাজ করতে বাধ্য হত।

2, কৃষকদের শোষণ : রাশিয়ার দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিক সীমাহীন অর্থনৈতিক শােষণের শিকার হয়েছিল। তারা রাষ্ট্র, জমিদার, গ্রামীণ 'মা ও গির্জাকে নানা ধরনের কর প্রদানে বাধ্য হত। মুক্তিপ্রাপ্ত ভূমিদাসরা জমির মালিকানা পেলেও এর জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

3. শ্রমিকদের শোষণ : রাশিয়ার শ্রমিকরা স্বল্প বেতনে প্রচুর সময় কাজ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হত। তারা উপলব্ধি করে যে, জারতন্ত্রের উচ্ছেদ না ঘটলে তাদের উন্নতির কোনাে আশা নেই।

4. অর্থনৈতিক দুরবস্থা : বিপ্লবের আগে রাশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে। দেশ বিদেশি ঋণের জালে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রাশিয়ার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৪০০ মিলিয়ন রুবল । রাশিয়ার শিল্পের বিদেশি পুঁজিপতিদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় ।

(৫) বলশেভিক / নভেম্বর / রুশ বিপ্লবের 1917 খ্রিস্টাব্দে বলশেভিক এর সাফল্যের কারণ কি ছিল ?

উত্তর
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জারতন্ত্রের পতন হয় এবং প্রিন্স লুভভ এর নেতৃত্বে বুর্জোয়া প্রজাতান্ত্রিক » সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর নভেম্বর মাসে এই সরকারের উচ্ছেদ ঘটিয়ে মার্কসবাদী বলশেভিক দল রাশিয়ার শাসন ক্ষমতা দখল করে।

রুশ/নভেম্বর/বলশেভিক বিপ্লবে বলশেভিকদের সাফল্যের কারণ

বলশেভিকদের এই সাফল্যের বিভিন্ন খারাপ ছিল-

1 . সেনাদের বিদ্রোহ: রুশ বিপ্লবের আগে জাবের সেনাদলের একাংশও বিদ্রোহীদের পক্ষে যােগ দেয় জারের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

2 . সাধারণ মানুষের ক্ষোভ; জারতন্ত্রের পতনের পর রাশিয়ায় প্রথমে প্রিন্স লুড় ও পরে কেরেংকারী সরকারের আমলে খাদ্যাভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, যুদ্ধজনিত ব্যয়ভার ও অশান্তির ফলে দেশের কৃষক ও শ্রমিকদের ক্ষোভ চরমে ওঠে। বলশেভিক দল এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।

3. সুযোগ্য নেতৃত্ব : বলশেভিক নেতা লেনিন সুযােগ্য নেতৃত্ব দিয়ে রাশিয়ার কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক, বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি সর্বস্তরের মানুষকে এই দলের ছন্ছায়ায় আনতে সন্ধান হন। তিনি কৃষকদের জন্য জমি, শ্রমিকদের জন্য রুটি এবং সৈনিকদের জন্য শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকলের কাছে বলশেভিক দল কে জনপ্রিয় করে তোলেন ।

4. প্রতিপক্ষের অনৈক্য: বলশেভিকদের বিরোধীরা নানা দল-উপদলে ও মতাদর্শে বিবেক থাকায় তারা যথেষ্ট দুর্বল ছিল । স্থানীয় মানুষ বলশেভিক বিরোধীরা পছন্দ করত না । তাদের অনৈক্য ও জনপ্রিয়তার বলশেভিক দের সুবিধা করে দিয়েছিল।

5. আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী: ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে এবং যুদ্ধের পর নিজেদের বিভিন্ন সমস্যায় ব্যস্ত থাকায় তারা রুশো বিপ্লবের সময় জার সরকারকে সাহায্য করার সুযোগ পায়নি ।

(৬) রাশিয়ায় অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে রুশ / নভেম্বর /বলশেভিক বিপ্লবের 1917 খ্রিস্টাব্দের গুরুত্ব গুলি কী ছিল ?

উত্তর
রাশিয়ার মার্কসবাদী বলশেভিক দলের নেতৃত্বে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়।

✓✓রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে রুশ/নভেম্বর বলশেভিক বিপ্লবের গুরুত্ব

রুশ বিপ্লব রাশিয়ার সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায়।

1. সর্বহারার একনায়কত্ব: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নভেম্বর মাসে বলশেভিক এই প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে রাশিয়ায়। “সর্বহারার একনায়কত্ব' প্রতিষ্ঠা করে। রাশিয়ার নতুন নাম হয় ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সােশ্যালিস্ট রিপাবলিক (USSR)।

2. সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা : লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে পুরাতনতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং রাশিয়ায় সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়াই হল প্রথম সাম্যবাদী রাষ্ট্র।

3. রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: সাম্যবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত বলশেভিক সরকার রাশিয়ায় ব্যক্তিগত মালিকানা অবসান ঘটায় এবং উৎপাদনের উপকরণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

4. কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ : সাম্যবাদী সরকার জমিদারদের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে তাদের জমিগুলি বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের মধ্যে বিলি করে। কলকারখানাগুলিতে ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটিয়ে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এগুলির পরিচালনার ভার শ্রমিকদের হাতে দেওয়া হয়।

5. অ-রুশদের মর্যাদাদান : রাশিয়ায় বসবাসকারী অ-রুশ বলি ও অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে তাদের রুশ- যৌনজীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় ।

Post a Comment

0 Comments