দশম শ্রেণীর বাংলা আফ্রিকা অধ্যায়ের কিছু গুরত্ব পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর । Class 10 Bengali Question and Answer

আজকে আমরা দশম শ্রেণীর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা আফ্রিকা কবিতার থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। মাধ্যমিক বাংলা পরীক্ষার প্রশ্ন গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দশম শ্রেণী বাংলা অধ্যায়ের আফ্রিকা প্রশ্ন ও উত্তর


দশম শ্রেণীর বাংলা কবিতা আফ্রিকা প্রশ্নোত্তর



1. “বাঁধলে তােমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায় - বনস্পতির নিবিড় পাহারা’ বলতে কী বােঝানাে হয়েছে?

উত্তর - প্রিশ্নোধৃত অংশে আফ্রিকার কথা বলা হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষত, মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় নিরক্ষীয় অঞ্চল হওয়ার জন্য ঘন অরণ্য রয়েছে। সেই নিবিড় অরণ্য ভেদ করে সূর্যের আলাে প্রবেশ করতে পারে না। প্রকৃতি যেন নিবিড়, নিশ্ছিদ্র পাহারায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে আফ্রিকাকে। এই ভৌগােলিক সত্যকেই রবীন্দ্রনাথ কাব্যিকভাবে তুলে ধরেছেন।

2. কৃপণ আলাের অন্তঃপুরে”—কৃপণ আলাে' বলার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করাে।

উত্তর - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত 'আফ্রিকা কবিতায় আফ্রিকা ভূখণ্ডের সৃষ্টিলগ্নের ইতিহাসটি বর্ণিত হয়েছে। রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচীন ধরিত্রীর বুক থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করেছিল অরণ্যসংকুল স্থানে। এমন এক ভৌগােলিক অবস্থানে আফ্রিকার জন্ম, যেখানে বেশিরভাগ স্থানই অরণ্যপরিবেষ্টিত। সূর্যের আলাে সেই নিবিড় অরণ্য ভেদ করে সেখানে পৌছােতে পারে না। এই কারণেই আফ্রিকার অবস্থানের জায়গাটিকে কবি 'কৃপণ আলাের অন্তঃপুর’ বলেছেন।

3. "আপনাকে উগ্র করে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়” প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা করাে।

উত্তর - সভ্যতাসৃষ্টির প্রথম পর্বে আফ্রিকা বাইরের পৃথিবীর কাছে নিজেকে পরিচিত করেছিল তার ভয়ংকর স্বরূপের মধ্য দিয়ে। আফ্রিকার প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাই একসময় তাকে রক্ষা করেছিল বহিঃশক্তির হাত থেকে। তার দুর্ভেদ্য অরণ্য ভেদ করে প্রবেশ করার অধিকার সূর্যরশ্মিরও ছিল না। বিরূপের ছদ্মবেশে আফ্রিকা যেন ভীষণ বহিঃপ্রকৃতিকে বিদ্রুপ করেছিল। নিজের ভয়কে সে জয় করেছিল বিভীষিকাকে আশ্রয় করে।


4. অপরিচিত ছিল তােমার মানবরূপ/উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে”—মন্তব্যটির তাৎপর্য লেখাে।

উত্তর - আদিম অরণ্য আর মরুভূমি অধ্যুষিত আফ্রিকা এক দীর্ঘ সময় ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে যােগাযােগহীন | উন্নত পৃথিবী মুখ ফিরিয়ে থেকেছে আফ্রিকার থেকে। রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছেন 'ছায়াবৃতা', আর সাংবাদিক হেনরি স্ট্যানলি আফ্রিকা সম্পর্কে দিয়েছিলেন সেই বছুশ্লত বিশেষণ 'dark continent' ইতিহাস প্রমাণ করে উনবিংশ শতাব্দীর আগে কোনাে ইউরােপীয় শক্তি আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের কথা ভাবেনি। আফ্রিকার সম্পদ এবং সংস্কৃতি এভাবেই উপেক্ষিত হয়েছিল সভ্য সমাজের দ্বারা।

5. "এল ওরা লােহার হাতকড়ি নিয়ে /নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে।"-মন্তব্যটির দ্বারা কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে?

উত্তর - সাধারণভাবে মনে হয়, আফ্রিকায় যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ঘটেছিল তার অত্যাচারী স্বরূপকে তুলে ধরাই ছিল কবির লক্ষ্য। কিন্তু শুধু এটুকুই নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ইতিহাসের এক ধারাক্রমকে তুলে ধরেছেন, যা থেকে মনে হয় এখানে কবি পঞ্চম শতক থেকে প্রায় আধুনিক কাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল যে দাসব্যবস্থা সেদিকেও ইঙ্গিত করেছেন। এল মানুষ-ধরার দল - এতে দাসব্যবস্থা ও দাস-মালিকদের অত্যাচারী স্বরূপের দিকেই ইঙ্গিত আছে।

6. গর্বে যারা অন্ধ তােমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে। কারা গর্বে অন্ধ ? অরণ্য সূর্যহারা কেন ?

উত্তর - সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক প্রভুদের কথাই এখানে বলা হয়েছে। তারা বর্ণকৌলীন্যে এবং ক্ষমতার গর্বে অন্ধ |


আদিম আফ্রিকার ভৌগােলিক অবস্থান ছিল দুর্গম, রহস্যময়। চারিদিকে ঘন বনস্পতি যেন আফ্রিকাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এতই ঘন অরণ্যসংকুল স্থানে আফ্রিকার অবস্থান ছিল যে, সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছােতে পারত না। চিরছায়ায় আফ্রিকা যেন। কালাে ঘােমটার নীচে তার মানবরূপকে ঢেকে রেখেছিল| এইজন্যই অরণ্যকে সূর্যহারা বলা হয়েছে।

7. কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল/সুন্দরের আরাধনা"এই বেজে ওঠার তাৎপর্য কী?


উত্তর - আধুনিক সভ্যতার বৈপরীত্যকে রবীন্দ্রনাথ এখানে তুলে ধরেছেন। তথাকথিত সভ্য ইউরােপীয় শক্তিরা আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে তীব্র শােষণ চালাত। আফ্রিকানদের পাঠানাে হত যুদ্ধক্ষেত্রে, পশুর মতাে তাদের নিয়ে কেনাবেচা চলত। একদিকে যখন মনুষ্যত্বের এরকম লাঞ্ছনা, সেই একই সময়ে সভ্য দুনিয়ায় ঈশ্বরের প্রার্থনা চলত, শিশুরা খেলত মায়ের কোলে, কবির সংগীতে বেজে উঠত সুন্দরের আরাধনা। অর্থাৎ জীবন সেখানে থাকত শান্ত ও সুন্দর।

8. “এসাে যুগান্তের কবি”—যুগান্তের কবিকে কোথায় আসতে বলা হয়েছে? সেখানে এসে তিনি কী করবেন?

উত্তর - আফ্রিকা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যুগান্তের কবিকে আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিতে অবমানিত আফ্রিকার দ্বারে এসে দাঁড়াতে বলেছেন।


আফ্রিকার জনগণের ওপর ইউরােপীয় ঔপনিবেশিকদের অত্যাচার মানবতার অপমান। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের উচিত এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানাে। যুগান্তের কবিও তাদেরই | প্রতিনিধি। মানহারা আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে সত্য ও সুন্দরের পুজারি কবিকেও বলতে হবে ক্ষমা করাে। আর সেটাই হবে সভ্যতার শেষ পূর্ণবানী।

9. "দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে।" কাকে এই আহ্বান। করা হয়েছে? তাঁর প্রতি কবির এরূপ আহ্বানের কারণ কী?

উত্তর - কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা কবিতায় যুগান্তের কবিকে এই আহবান জানানাে হয়েছে।

আফ্রিকা অত্যাচারিত হয়েছে ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা। দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতাের তলায় ক্ষতবিক্ষত সেই ভূখণ্ডের মাটি। নিরীহ আফ্রিকাবাসী মুখবুজে সহ্য করেছে লাঞ্ছনা| সভ্য মানুষ কখন ফিরেও তাকায়নি এই মানহারা আফ্রিকার দিকে। যুগান্তের কবি সভ্য মানুষের প্রতিনিধি। তাই মানহারা আফ্রিকার দ্বারে দাঁড়িয়ে সমগ্র সভ্য মানুষের হয়ে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। এই কারণেই কবি তাকে আহবান জানিয়েছেন।

10. “দাড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে/বলাে ক্ষমা করাে” মানহারা মানবী কথাটি ব্যাখ্যা করাে। কাকে, কেন তার কাছে। ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা' কবিতায় কবি আফ্রিকাকেই "মানহারা মানবী বলেছেন। কারণ উন্নত ইউরােপীয় সভ্যতা আফ্রিকাকে শােষণ করলেও, তার বুকে উপনিবেশ স্থাপন করলেও আফ্রিকার জীবনধারা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেয়নি। উপেক্ষার আবিল অন্ধকার’-এ আফ্রিকাকে ডুবে থাকতে হয়েছে | দাসব্যবস্থা থেকে উপনিবেশিকতা বঞ্চনার ইতিহাস আফ্রিকাকে বেষ্টন করে আছে। মানহারা মানবী' কথাটির দ্বারা এই বঞ্চনার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

যুগান্তের কবিকে এখানে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কারণ সৃষ্টিশীল কবিমাত্রেই সত্য এবং সুন্দরের কথা বলেন। তাই যে শােষণনার শিকার হতে হয়েছে আফ্রিকাকে—একজন কবিই তার সংবেদনশীলতা দিয়ে তা উপলব্ধি করতে পারেন। 'আফ্রিকা কবিতা রচনার সমকালে ইউরােপের বিভিন্ন দেশে শাসনক্ষমতার পরিবর্তন হতে থাকে| আফ্রিকা এবং তার অধিবাসীদের ওপরে যে অত্যাচার হয়েছে তার ক্ষমা ভিক্ষা' প্রার্থনা করাটাই সভ্যতার সবথেকে বড়াে কর্তব্য হওয়া উচিত বলে কবি মনে করেছেন। চারপাশে হিংস্র প্রলাপের মধ্যে একেই কবি সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ কবি চেয়েছেন, যে নতুন আফ্রিকা তৈরি হবে, মানবিক প্রশান্তিই যেন তার পাথেয় হয়।

11. “চিরচুিহ্ন দিয়ে গেল তােমার অপমানিত ইতিহাসে কারা, কীভাবে কিসের 'চিরচিহ্ন' দিয়ে গেল ? সমুদ্রপারে সেই সময় কী ঘটেছিল?

উত্তর - আফ্রিকা কবিতায় সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় শক্তিসমূহ আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাস 'চিরচিহ্ন দিয়ে গিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আফ্রিকা' কবিতায় আফ্রিকার ও সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের অত্যাচার ও শােষণ-বঞ্চনার কাহিনিকের দিয়েছেন। প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম আফ্রিকা দীর্ঘ সময়জুতে ইউরােপীয় শক্তিসমূহের নজরের বাইরে ছিল। কিন্তু উনিশ শতকে ইউরােপীয়রা আফ্রিকায় উপনিবেশদ্যাপন শুরু করে এবং এই শতকের শেষে প্রায় পুরাে আফ্রিকা ইউরােপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। এইসব তথাকথিত সভা রাষ্ট্রশক্তি আফ্রিকার মানুষদের উপরে নির্মম অত্যাচার চালাত। তাদের নিজ লােভ যেন বর্বরতার রূপ ধরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল আফ্রিকার মানুষ। তাদের রক্ত আর অণুতে কমান্ত হয়েছিল আফ্রিকার মাটি। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনায়কদের কাঁটামার জুতাের নীচে বীভৎস কাদার পিণ্ড যেন চিরকালের মতো অত্যাচারের চিহ্ন রেখে গিয়েছিল আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে।

আফ্রিকায় যখন মানবতার এই লাঞ্ছনা ঘটছে সেই সময় তথাকথিত সভ্য দুনিয়ায় যথানিয়মে জীবনধারা বহমান ছিল। সেখানে সমুদ্রপারে পাড়ায় পাড়ায় দয়াময় দেবতার নামে মন্দিরে বাজছিল পুজোর ঘষ্টা। শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে। অর কবির বীণায় সংগীতের সুরে বেজে উঠছিল সুন্দরের আরাধনা। অর্থাৎ আফ্রিকার রক্তাক্ততার, লানার বিপরীতে সমুদ্রপারে এভাবেই স্পষ্ট হয়েছিল এক শান্ত এবং নিশ্চিন্ত জীবনের ছবি।

12. ‘আফ্রিকা’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে আলােচনা করাে।

উত্তর - রবীন্দ্রনাথের 'আফ্রিকা কবিতাটি উপেক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা এক মহাদেশের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। সৃষ্টির সূচনা থেকেই আফ্রিকা নিবিড় অরণ্যে পূর্ণ অসূর্যম্পশ্যা এক দেশ | কিন্তু সেই ভয়ংকরতাই হয়েছে আফ্রিকার রক্ষাকবচ।বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায়’ আফ্রিকা নিজেকে রক্ষা করার উপায় খুঁজে নিয়েছে। অন্যদিকে, দুর্গম এবং দুর্বোধ্য আফ্রিকাকে উপেক্ষা করেছে উন্নত বিশ্ব। তার পরিচয় থেকে গিয়েছে অন্ধকার মহাদেশ হিসেবেই | ধীরে ধীরে আফ্রিকার সঙ্গে বহির্বিশ্বের যােগাযােগ তৈরি হয়েছে। এসেছে 'মানুষ-ধরার দল। তৈরি হয়েছে দাসব্যবস্থা, যা কিনা অরণ্যের আদিমতার থেকেও আদিম এক অধ্যায়। তারপরে উন্নত ইউরােপ উপনিবেশ স্থাপন করেছে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে। সভ্যের বর্বর লােভ আফ্রিকায় তৈরি করেছে নির্লজ্জ অমানবিকতার আর-এক ইতিহাস। রক্ত আর চোখের জলে ভিজে গেছে আফ্রিকার মাটি। অথচ অন্য প্রান্তে উন্নত দেশগুলিতে একইভাবে তখন অব্যাহত, ঈশ্বরের আরাধনা কিংবা কবির সংগীত।

দিনের অন্তিমকাল ঘােষণার সময় যখন সমাগত, তখন কবি যুগান্তরে কবি'কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন 'মানহারা মানবী আফ্রিকার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে। মানুষের যাবতীয় ভবােধকে এই ক্ষমার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন কবি। হিঃস্র প্রলাপ-এর মধ্যে এই হবে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাগী' | এভাবেই বিশ্বমানব-মৈত্রীর মধ্য দিয়ে আফ্রিকার এক নব উত্থানকে কল্পনা করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ।