দশম শ্রেণীর বাংলা প্রবন্ধ রচনা প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন ।দশম শ্রেণীর বাংলা প্রবন্ধ রচনা | তোমার জীবনের স্বরনীয় ঘটনা | কন্যাশ্রী প্রকল্প প্রবন্ধ রচনা | কম্পিউটার ও আধুনিক পৃথিবী |

আজকে আমরা আলোচনা করব দশম শ্রেণীর বাংলা প্রবন্ধ রচনা প্রশ্ন উত্তর সাজেশন নিয়ে এই প্রশ্নগুলি আগামী পরীক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।


দশম শ্রেণীর বাংলা প্রবন্ধ রচনা প্রশ্ন ও উত্তর সাজেশন ।


দশম শ্রেণীর বাংলা প্রবন্ধ রচনা


1. তোমার জীবনের স্বরনীয় ঘটনা ।

উত্তর - ভূমিকা:- বহতা নদীর মতাে এগিয়ে চলে মানুষের জীবন। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির চড়াই উতরাই ভেঙে সে চলা নতুনের উপকূলে। কিন্তু পথ চলতে চলতে বারবার পিছন ফিরে তাকায় এই মানুষই । সেখানে ভেসে ওঠে কত মুখ, কত ঘটনা স্মৃতির উত্তাপে সঞ্জীবিত হয় সে।

আমার কথা :- আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনেও ভিড় করে আছে কত ঘটনা। সেখানে প্রথম রাজ্য ছাড়িয়ে বেড়াতে যাওয়া, প্রথম বইমেলা দেখা, প্রথম প্লেনে চড়া কিংবা প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে পুজোর ঠাকুর দেখতে যাওয়ার স্মৃতি যেমন আজও সজীব হয়ে আছে, ঠিক তার পাশে চোখে ভেসে ওঠে একদিন সকালে চা খেতে খেতে দাদুর মৃত্যু। হাসি-কান্নার আলােছায়ার এই আবহে একটিমাত্র স্মরণীয় ঘটনা বেছে নিতে বললে সেটি হল আমার প্রথমদিন হাই স্কুলে যাওয়া।

সলতে পাকানাের কাল :- আমি আমার প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি টাকি সরকারি বিদ্যালয়ে। সকাল সাড়ে ছটায় আমার স্কুল শুরু হত। নিত্যদা ঢং ঢং করে ঘণ্টা দিতেন আর আমরা গিয়ে দাঁড়াতাম স্কুল গ্রাউন্ডে প্রার্থনা সংগীত-এর জন্য। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি—কৃষ্ণ স্যার, বলাই স্যার, মেনকা ম্যাডাম এঁদের স্নেহচ্ছায়ায় কেটে গেছে আমার জীবন। তারপর পঞ্চম শ্রেণির রেজাল্ট বেরােনাে। বাবা বললেন আমার সকালে আসার দিন শেষ। শুরু আমার হাইস্কুল জীবন ।

প্রথম সে দিন :- স্কুলের নতুন পোশাক পড়ে বাবার সঙ্গে স্কুলে পৌছালাম ঠিক সাড়ে দশটায় । সেই একই বিল্ডিং এ কি ক্লাসঘর শুধু মানুষগুলোই আলাদা । চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বড় বড় দাদারা। মাথা উঁচু করে দেখতে হয়, এগারাে বারাে ক্লাসে পড়ে ওরা। পাশে বাবাও নেই। জনারণ্যে কেমন যেন একা একা লাগতে শুরু করল। প্রার্থনাশেষে এগারােটায় ক্লাশ শুরু হল। দীর্ঘদেহী একজন শিক্ষকমশাই রােলকলের খাতা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। গম্ভীর গলা, পরে জেনেছি নাম দুর্গাদাস বাবু। ইংরেজি গ্রামার পড়ালেন| কিছু গল্পও করলেন। তারপর একে একে এলেন বাংলা, ইতিহাস, ভূগােল আর আঁকার স্যার। ইতিহাসের স্যার তারক বাবু খুব মজা করেছিলেন। আস্তে আস্তে মনের ভয়টা কেটে গেল। শুধু টিফিনের সময় মাঠে যাইনি, কারণ ওখানে বড়ােরা খেলছিল। এরই মধ্যে একবার হেডস্যার ক্লাশে ঘুরে গেলে। পিঠে হাত দিয়ে আমাদের কেমন লাগছে জানতে চাইলেন। ঠিক চারটেয় ছুটি হল। গেটের বাইরে গিয়ে বাবার হাত ধরলাম |

উপসংহার: - সেদিনের আড়ষ্টতা কাটিয়ে আমি এখন ক্লাস টেন। স্কুলমাঠে খেলতে এখন আর আমার কোনাে দ্বিধা নেই। বাংলার বিজয়বাবু, অংকের চঞ্চল বাবু, ইতিহাসের তারকবাবু— স্যারেদের নামগুলােই শুধু জানি নি, পেয়েছি তাদের স্নেহসান্নিধ্যও। এখন আমি নিজেই স্কুলে আসি। এ বছর মাধ্যমিক দেব| স্যারেরা বলেন আসল পরীক্ষা এবারই শুরু হবে। স্কুল ছাড়িয়ে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—এগিয়ে চলবে জীবন। কিন্তু স্কুলের ঘাসে প্রথমবার রেখে যাওয়া আমার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পায়ের ছাপ, প্রথম দিনের স্মৃতি সে তাে ঘুমঘাের থেকে বারবার আমাকে ডাকে। প্রথম দিনের সূর্যের মতােই তা চিরভাস্বর, চির অমলিন হয়ে থাকবে আমার জীবনে।


2. কন্যাশ্রী প্রকল্প ।

উত্তর - ভূমিকা: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই প্রজাকল্যাপসাধন। সমাজে আর্থিক বৈষম্য দূর করা, শিক্ষা এবং খাদ্য বস্ত্র- বাসস্থানের অধিকারকে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারের পরিকল্পনা তৈরি হয় এইসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। ২০১৩ সালে প্রবর্তিত ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প এই উদ্দেশ্যসাধনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ |

প্রেক্ষাপট : কন্যাশ্রী প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার এক করুণ ইতিহাস। ২০১১-র জনগণনায় দেখা গিয়েছে যে পশ্চিমবাংলায় বয়ঃসন্ধিকালীন মােট জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৩ লক্ষ। এর মধ্যে ৪৮.১১ শতাংশই হচ্ছে মেয়ে। আবার পশ্চিমবাংলার মােট জনসংখ্যার ৯.৩ শতাংশ হচ্ছে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি মেয়ে, আর ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি মেয়েদের ক্ষেত্রে এই পরিমাপ ৯.৫ শতাংশ। কিন্তু এই যে বিপুল নারীশক্তি, তাদের জীবনবিকাশের পথ কিন্তু একেবারেই মসৃণ নয়। দারিদ্র, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং লিঙ্গগত বৈষম্যের শিকার হয়ে এদের বিরাট অংশকে জীবন কাটাতে হয়, অনেকেই হারিয়ে যায় সমাজের অন্ধকারে। UNICEF-এর সমীক্ষায় শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের নিরিখে ভারতের মধ্যে পশ্চিমবাংলার স্থান তৃতীয়। পরিসংখ্যান অনুসারে ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের মধ্যে .৭ শতাংশই দ্রুত বিবাহের শিকার। গ্রামীণ এলাকায়। সংখ্যাটা আরও বেশি— ৫৭.৯ শতাংশ। এই দ্রুত বিবাহের ফলে। একদিকে যেমন এইসব মেয়েরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্ছিত হয়, তেমনি তারা নানারকম অপুষ্টির শিকার হয়, যা পরবর্তী প্রজন্মকেও প্রভাবিত করে। মেয়েদের এই দুর্দশা সামাজিক প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অবস্থা কতটা শােচনীয় তা স্পষ্ট হয় যখন পরিসংখ্যানে দেখা যায় স্কুলছুটদের ৬৩.৫ শতাংশই হল মেয়ে। সমাজের দুর্বল, পিছিয়ে পড়া এবং হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এইসব মেয়েদের আলাের পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করে কন্যাশ্রী প্রকল্প, যার ঘােষিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়- "To reduce dropout rate and prevent early marriage" |

প্রকল্পের রূপরেখা:- ১০ থেকে ১৮ বছর বয়স এই সময়কালকে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা বলেছে মানুষের জীবনগঠনের কাল। কন্যাশ্রী প্রকল্পের ভাবনাও এই বয়সকে পরিচর্যা করার জন্যই । নারী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রক জানিয়েছে যে, যে সব মেয়েদের পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বা তার কম, তারা বছরে ৫০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য পাবে এবং ১৮ বছর অবধি পড়া চালিয়ে গেলে ১৮ বছর বয়সে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকার ২৫ হাজার টাকা প্রদান করবে। ২০১৫ সালের রাজ্য বাজেটে এই বৃত্তির পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে যেখানে ২৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল ২০১৫-১৬ তে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫০ কোটি। ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা আজও যথেষ্ট, সেখানে মেয়েদের সামাজিক সুরক্ষায় এই প্রকল্প যে যথেষ্ট কার্যকরী তা বলাই বাহুল্য। সরকারি তথ্য অনুসারে প্রায় ২২ লক্ষ মেয়ে ইতিমধ্যেই এর দ্বারা উপকৃত |

উপসংহার :- কন্যাশ্রী প্রকল্প শুধু দেশের মধ্যে নয়, গােটা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০১৪ সালে UNICEF এর মেয়েদের জন্য অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে লন্ডনে রাজ্যকে কন্যাশ্রী প্রকল্প সম্পর্কে অবহিত করার জন্য আহ্বান জানানো হয় । এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে রাজ্য সরকার 14 আগস্ট এ দিনটিকে কন্যাশ্রী দিবস রুপে ঘোষণা করেছে । মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী প্রকল্প কে ভবিষ্যৎ পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছেন । প্রশাসনিক সদিচ্ছা আর সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কন্যাশ্রীর মতো অসমান্য প্রকল্প আরো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে ।


3. কম্পিউটার ও আধুনিক পৃথিবী ।

উত্তর - ভূমিকা:- মানব সভ্যতার গতিপথকে পালটে দেওয়া বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার হল কম্পিউটার। মানুষের জ্ঞান এবং প্রচেষ্টার সীমানাকে বহুদূর অবধি বিস্তৃত করে দিয়েছে কম্পিউটার। পুরােনাে পৃথিবীর সঙ্গে নতুনের অনতিক্রমণীয় ব্যবধান তৈরি করে মানবসভ্যতার সামনে এই কম্পিউটারই হাজির করেছে এক শিহরন জাগানাে ভবিষ্যতের ছবি।

আবিষ্কার :- অনেকে মনে করেন খ্রিস্টের জন্মেরও আগে অ্যাবাকাস নামে যে গণনাপদ্ধতি প্রচলিত ছিল তার মধ্যেই নিহিত আছে কম্পিউটারের আদি ইতিহাস | উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ গণিতজ্ঞ চার্লস ব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়। ১৯৩০-এ হওয়ার্ড আইকেন এবং গ্রেস হপার সাধারণের ব্যবহারের উপযােগী কম্পিউটার তৈরি করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানিতে, ব্রিটেনে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারের দ্রুত বিবর্তন ঘটে। এখান থেকে এখন মানবসভ্যতা এসে পৌঁছেছে পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটারে।

ভারতে কম্পিউটার:- ভারতে ১৯৫৫ সালে প্রথম কম্পিউটার আসে। কিন্তু আটের দশক থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় স্তরে বিশেষ গুরুত্ব আরােপ করেছেন। পৃথিবীতে কম্পিউটার উৎপাদনে যেমন ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সেরকমই কম্পিউটার গবেষণায় মুম্বাইয়ের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সফটওয়্যার টেকনোলজি, টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে ।

কম্পিউটারের প্রয়ােগ:- আধুনিক সভ্যতায় কম্পিউটারের প্রয়ােগ সর্বাত্মক যে-কোনাে হিসাবনিকেশে, আবহাওয়ার। পূর্বাভাস প্রদানে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে, মুদ্রণ শিল্পে কম্পিউটারের। ব্যবহার বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। উপগ্রহ যােগাযােগ, যান। চলাচলের সিগন্যালিং ব্যবস্থা সবই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। আবার রেল বিমানের আসন সংরক্ষণ থেকে টেলিফোন, ইলেকট্রিক বিল প্রদান-ব্যক্তিগত জীবনেও কম্পিউটারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কম্পিউটারের সাহায্যেই আন্তর্জাতিক সংযােগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের জ্ঞানসাম্রাজ্য চলে আসে ঘরের মধ্যে। তাই হাটে বাজারে, অফিসে-আদালতে, স্কুল-কলেজে কম্পিউটারের আজ সর্বাত্মক ব্যবহার ঘটছে। ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, পামটপ ইত্যাদি নানা চেহারায় কম্পিউটার আজ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।

অন্য কথা :- কম্পিউটার অসম্ভবের সীমারেখাকে প্রায় মুছে দিয়েছে। কিন্তু এই কম্পিউটারই মানুষের প্রয়ােজনীয়তা কমিয়ে দিয়ে কর্মসংকোচনের পথ তৈরি করেছে। কম্পিউটার মানুষকে শুধু যন্ত্রনির্ভরই করে নি, জীবনযাপনের অন্য প্রকরণগুলি যেমন, বইপড়া, ছবি আঁকা এসব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সিনেমা, গান ইত্যাদিকে কম্পিউটার এতটাই সহজলভ্য করে দিয়েছে যে, এদের কেন্দ্র করে যে ব্যবস্থা হয় তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে । দীর্ঘকালীন কম্পিউটারের ব্যবহার নানা শারীরিক সমস্যাকেও ডেকে আনছে ।

উপসংহার :- ইতিবাচকতার বিরাট ক্ষেত্রকে দেখলে কম্পিউটার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা গুলিকে নিতান্তই লঘু মনে হয় । একুশ শতকের গতিশীল পৃথিবীর কম্পিউটার শুধু অলংকার নয় , মস্তিষ্ক ও । তাই এর পরিচর্যা এবং উন্নতিতে আত্মনিয়োগের আধুনিক মানব সভ্যতার অনিবার্য নিয়তি ।