নবম শ্রেনীর ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়ের কিছু গুরত্ব পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর । Class 9 History Question And Answer

আজকে আমরা আলোচনা করব নবম শ্রেণীর ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়ের কিছু গুরত্ব পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে।

নবম শ্রেনীর ইতিহাস গুরুত্ব পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর 

নবম শ্রেনীর ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়ের কিছু গুরত্ব পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর । Class 9 History Question And Answer

1. ইউরােপে জাতীয়তাবাদী ধারণার বিকাশের পরিচয় দাও ।

উত্তর - ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯ খ্রি.) আগে ইউরােপের মানুষ রাজতন্ত্রের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য প্রকাশ করত। বিভিন্ন জাতিকে পদানত করে সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটানােই ছিল সে যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।


ইউরােপে জাতীয়তাবাদী ধারণার বিকাশ


বিপ্লবের পরবর্তীকালে ইউরােপে পরিস্থিতি পালটে যায় এবং রাজতন্ত্র বিরােধী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে।

১. ফ্রান্সে জাতীয়তাবাদ : ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারী রাজা ও রাজতন্ত্রের পরিবর্তে দেশ ও জাতির প্রতি আনুগত্য জানাতে শুরু করে। এভাবে তাদের মনে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের জন্ম হয়। ফ্রান্সের জাতীয় সভা' ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে পিতৃভূমি বিপন্ন বলে ঘােষণা করলে ফরাসিদের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবােধের প্রসার ঘটে। দেশে একই ধরনের আইনকানুন চালু হলে দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবােধ আরও তীব্র হয়।

২. ফ্রান্সের বাইরে জাতীয়তাবাদ : ফরাসি সম্রাট নেপােলিয়ন তার সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা বিপ্লবের ভাবধারা ইউরােপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেন। ফলে ফরাসি জাতির জাতীয়তাবাদী চেতনা ইউরােপের অন্যান্য দেশেও প্রসারিত হয় । এর ফলে ফ্রান্সের বাইরে ইতালি জার্মানি পোল্যান্ড পর্তুগাল অস্ট্রিয়া গ্রীস বেলজিয়াম বলকান প্রভৃতি অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী যুক্তি সংগ্রাম শুরু হয় ।

৩. নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তি যুদ্ধ : ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী কালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি কে প্রধানত করে ফরাসি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন । কিন্তু তাঁর রাজত্বের শেষদিকে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে পড়ে । ফলে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্পেন পর্তুগাল জার্মানি প্রভৃতি দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ।


2. ভিয়েনা সম্মেলনে (১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে) বিজয়ী চতুর্থ শক্তি জোটের প্রধান শক্তি গুলির উদ্দেশ্য কি ছিল ?

উত্তর - চতুর্থ শক্তিজোটের কাছে নেপােলিয়নের পতন (১৮১৪ খ্রিঃ.) ঘটে । এই জোটের অন্যতম সদস্য অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রশীয়া ও ইংল্যান্ড ভিয়েনা সম্মেলনে 'চার প্রধান ('Big Four) শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


ভিয়েনা সম্মেলনে বিজয় শক্তিগুলির উদ্দেশ্য


ভিয়েনা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন উদ্দেশ্য। লক্ষ্য করা যায়। যেমন -

১. ঘােষিত উদ্দেশ্য : বৃহৎ শক্তিগুলি 'ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে ইউরােপের পুনর্গঠন, ইউরােপের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন', ইউরােপে 'স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি উচ্চ আদর্শের কথা ঘােষণা করে। কিন্তু বাস্তবে তারা রক্ষণশীলতা প্রতিষ্ঠা ও নিজেদের ভৌগােলিক স্বার্থ পূরণে বেশি তৎপর ছিল।

২. রক্ষণশীলতা : অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া এবং ইংল্যান্ড ভিয়েনা। সম্মেলনে প্রতিক্রিয়াশীল মনােভাব গ্রহণ করে। ইউরােগে বিপ্লবী ভাবধারার প্রসার রােধ করে রক্ষণশীলতা বজায় রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

৩. ভৌগােলিক স্বার্থ :বিজয়ী শক্তিবর্গ নিজেদের ভৌগােলিক এক্তিয়ার সম্প্রসারণে তৎপর ছিল। [i] অস্ট্রিয়া পােল্যান্ডের রাজ্যাংশ এবং ইটালিতে তার আধিপত্য বজায় রাখতে চাইত। তা ছাড়া সে রাশিয়ার শক্তিবৃদ্ধি ও জার্মানিতে প্রাশিয়ার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাতার বিরোধীতা ছিল । [ii] রাশিয়া: রাশিয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পোল্যান্ড আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা । [iii] ব্রিটেন : ব্রিটেনের জেনোয়ার স্বাধীনতার পক্ষে ছিল । [v] প্রাশিয়া : প্রাশিয়া পোল্যান্ডের রাজবংশ দাবি করত ।


3. মেটারনিখ পদ্ধতি'/মেটারনিখ ব্যবস্থা' বলতে কী বােঝ ?

উত্তর - অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স ক্লেমেন্স মেটারনিখ ছিলেন সমকালীন ইউরােপীয় রাজনীতির উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে ইউরােপীয় রাজনীতিতে তিনিই ছিলেন প্রধান নিয়ন্ত্রক। এজন্য ঐতিহাসিক ফিশার এই সময়কালকে 'মেটারনিখের যুগ বলে অভিহিত করেছেন।

মেটারনিক পদ্বতি/ মেটারনিখ ব্যবস্থা

মেটারনিখ যতদিন অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ততদিন অস্ট্রিয়ায় এবং ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভিয়েনা সম্মেলনের সিদ্ধান্তের দ্বারা ইউরােপের অন্যান্য দেশে বিভিন্ন তীব্র রক্ষণশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল- [i] ইউরোপের বিপ্লবের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। [ii] ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত উদারতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র প্রভৃতি প্রগতিশীল ভাবধারার অগ্রগতি রােধ করা। [iii] অস্ট্রিয়ার স্বার্থসিদ্ধি করা এবং ইউরােপে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য বজায় রাখা | এই নীতিগুলি বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে মেটারনিখ অস্ট্রিয়া তথা ইউরােপে যে দমনমূলক নীতি চালু করেন তা মেটারনিখ পদ্ধতি বা মেটারনিখ ব্যবস্থা বা মেটারনিখ সিস্টেম নামে পরিচিত।


4. মেটারনিক তার নীতি কে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ?

উত্তর -
রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্স মেটারনিক অস্টিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তার রক্ষণশীল নীতি বাস্তবায়ন করেন ।

মেটারনিখের পদক্ষেপ

মেটারনিখ তার রক্ষণ শীল নীতি বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন -

১. আধুনিক ভাবধারা প্রতিরোধ : মেটারনিখ ফরাসি বিপ্লব প্রসূত গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, উদারতন্ত্র প্রভৃতি। আধুনিক ভাবধারাগুলি ধ্বংস করার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ নেন।

২. ন্যায্য অধিকার নীতি : মেটারনিখ ভিয়েনা সম্মেলনে ন্যায্য অধিকার নীতির মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সিংহাসনে বিপ্লবের পূর্ববর্তী সময়ের রাজবংশগুলিকে ফিরিয়ে আনেন।

৩. স্থিতাবস্থা : মেটারনিখ রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যাবতীয় পরিবর্তন ও সংস্কারের বিরােধিতা করে স্থিতাবস্থা রক্ষার চেষ্টা করেন। তিনি ইউরােপের রাজন্যবর্গকে পরামর্শ দেন যে, "রাজত্ব করুন, কোনাে পরিবর্তন বা সংস্কার করবেন না।

৪. কঠোর নিয়ন্ত্রণ : মেটারনিখ প্রগতিশীল চিন্তাধারার অগ্রগতি প্রতিরােধ করার উদ্দেশ্যে সংবাদপত্র, সভাসমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি সবক্ষেত্রে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরােপ করেন।

৫. অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা: মেটারনিখ মনে করতেন যে, বৈপ্লবিক ভাবধারাগুলি রাজনৈতিক মহামারির মতাে এক দেশ থেকে দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে । এই মহামারীর হাত থেকে অস্ট্রিয়াকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপীয় শক্তি সমবায়ের সহায়তার ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তার নীতি প্রয়োগ করে ।